বাংলাদেশ এখনও এমন একটি দেশ যেখানে সামাজিকভাবে মেয়েদের কাজ করাকে ভালোভাবে দেখে না। যদিও এ দেশের রাষ্ট্রের প্রধান একজন নারী, বিরোধী নেত্রী নারী, এর বাইরে বড় একটি দলের প্রধানও নারী। এমনকি সংসদে নারী সদস্যের সংখ্যাও কম নয়, তবুও এসব উপাত্ত দেশের প্রকৃত বাস্তবতাকে তুলে ধরে না। দেশের কর্মক্ষেত্রে উচ্চাকাঙ্খী নারী বা উচ্চপদে দায়িত্বপালনকারী নারীর সংখ্যা হাতেগোনা। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এই সংখ্যা একেবারেই নগণ্য। মজার ব্যাপার হলো, এই সমস্যা একেবারে আমাদের ঘরোয়া সমস্যা না, পাশ্চাত্যের অনেক দেশেই র্কমক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ অনেক কম। হার্ভাড বিজনেস রিভিউর ‘সেরা সিইও’ র‌্যাংকিং এ দেখা যায় মাত্র ২ ভাগ প্রধান নির্বাহী নারী।

বাংলাদেশে যদিও মেয়েরা আগের যেকোন সময়ের চেয়ে বাসার বাইরে কাজে যোগ দিচ্ছে বেশি। এখানে আমরা ৬ জন নারীকে তালিকাভুক্ত করেছি, যারা তথ্য-প্রযুক্তি খাতে অসাধারণ ক্যারিয়ার গড়েছেন, কেউ নিজের কোম্পানি গড়েছেন, কেউ বা প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির প্রধান বা গুরুত্বর্পূণ জায়গায় দায়িত্বপালন করছেন। বলাবাহুল্য, এই তালিকা কোন মেধা/যোগ্যতার ক্রমধারা না মেনেই তৈরি করা হয়েছে।

লুনা সামসুদ্দোহা: প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, দোহাটেক নিউ মিডিয়া

লুনা সামসুদ্দোহা সফটওয়্যার ফার্ম দোহাটেক নিউ মিডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৯২ সালে, যখন এদেশে পুরুষরাই তথ্য-প্রযুক্তি খাতে ক্যারিয়ার গড়ার চিন্তা করতো না, সেসময় তিনি এই কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে কোম্পানিটি বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সফটওয়্যার সল্যুশন, ডিজাইন, ডেভলপমেন্ট সেবা প্রদান করছে। তাদের উল্লেখযোগ্য সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে বিশ্বব্যাংক, প্যান-আমেরিকান হেলথ অর্গানাইজেশন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, আমেরিকান পোস্টাল সার্ভিসেস অন্যতম।

বর্তমানে লুনা বিডব্লিউআইটির চেয়ারম্যান, যেটি দেশের তথ্য-প্রযুক্তি খাতে পেশাজীবি নারীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন। তিনি এরমাঝে দেশে-বিদেশে অসাধারণ “পথপ্রদর্শক” এর ভূমিকার জন্য সুনাম কুড়িয়েছেন। সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল থট লীডারের তিনি একজন সদস্য।

ফারহানা রহমান: প্রধান নির্বাহী ও চেয়ারপার্সন, আপলোড ইউরসেলফ সিস্টেমস লিমিটেড

ফারহানা মূলত স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিষয়ে কাজ করতেন। ২০০৩ সালে তিনি
অনুধাবন করলেন, দেশের তথ্য-প্রযুক্তি খাতে অনেক সুযোগ আছে, নিজে থেকে কিছু করার। তাই উৎসাহী হয়ে তিনি গ্রাফিক্স ও ওয়েব ডেভেলপমেন্ট বিষয়ে একটি কোর্স করে ফেলেন। এরপর তিনি একটি দেশি কোম্পানিতে গ্রাফিক্স ডিজাইনের পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ শুরু করেন। যেহেতু তার মূল লক্ষ্য ছিল নিজের একটা ব্যবসা শুরু করা, তাই তিনি চাকরিতে থাকার সময়ই গ্রাহক, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞসহ অনেকের সাথে যোগাযোগ গড়ে তুলেন।

অবশেষে তিনি ২০০৩ সালে আপলোড ইউরসেল্ফ সিস্টেম্স নামের সফটওয়্যার নির্মাণ ও ওয়েব সল্যুশন তৈরির কোম্পানি চালু করেন। শুরুর দিকে তিনি দেশি বাজার ধরার চেষ্টা করেন, কিন্তু তথ্য-প্রযুক্তি নিয়ে কম ধারণা থাকায় তখনকার দেশি কোম্পানিগুলো এধরনের সেবায় আগ্রহী ছিলনা। এই প্রতিকূলতা তাকে দমাতে পারেনি। তিনি এরপর বিদেশী গ্রাহক বিশেষত আমেরিকা ও ডেনিশ গ্রাহক খুঁজতে দেশের বাইরে যান। এভাবেই আগাতে থাকে তার উদ্যোগ। বর্তমানে আপলোড ইউরসেল্ফ সিস্টেম্স ১০০ ভাগ রপ্তানিমূখী একটি প্রতিষ্ঠান, যার অধীনে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আছে।

সোনিয়া বাশির কবির: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মাইক্রোসফট বাংলাদেশ

মাইক্রোসফট বাংলাদেশের প্রধান সোনিয়া সিলিকন ভ্যালি ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান The Indus Entrepreneurs নামের প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশি চ্যাপ্টারের প্রতিষ্ঠাতা ও বিডব্লিউআইটি’র ভাইস প্রসিডেন্ট।

মাইক্রোসফটে যোগ দেয়ার আগে তিনি সিনটেক নামের একটি তথ্য-প্রযুক্তি ভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়াও তিনি ডেল বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার, মাইক্রোসফটের দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ার ব্যবসায় উন্নয়ন কার্যক্রমের পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন। সোনিয়া আমরা টেকনলজিস এর চীফ অপারেটিং অফিসার হিসেবেও কাজ করেছেন।

সোনিয়ার বর্ণিল ক্যারিয়ারে শুরুটা সিলিকন ভ্যালি থেকে। ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি সিলিকন ভ্যালিতে সান মাইক্রোসিস্টেমস, ওরাকল এর মত কোম্পানিগুলেতো কাজ করেছেন। তিনি প্রায় ২০ বছর দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় ছিলেন।

আইভি হক রাসেল: মায়া ডট কমের প্রতিষ্ঠাতা

সাবেক ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার আইভি তথ্য ও কম্যুনিটির মাধ্যমে নারী ক্ষমতায়নের চিন্তা নিয়ে মায়া নামের উদ্যোগ শুরু করেন। ২০১১ সালে সেপ্টম্বরে শুরু করার পর মায়া হয়ে উঠেছে বর্তমানে দেশের সহায়তা প্রত্যাশী নারীদের মিলনমেলা। এখানে বিভিন্ন বয়সী নারীরা সমমনা নারীদের কাছ থেকে উপদেশ, সহায়তা পেয়ে থাকেন। গতবছর মায়া আপা নামে আইভি একটি মোবাইল এপ্লিকেশন চালু করেন, যার মাধ্যমে যে কেউ মায়া আপার কাছে প্রশ্ন করে কার্যকর উপদেশ পেতে পারে।

চট্টগ্রামে জন্মের পর আইভি ঢাকায় স্কলাস্টিকায় ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশুনা শেষ করার পর যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষার জন্য চলে যান এবং সেখানে ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ে তুলেন। এরপর তিনি মায়া নামের এই পোর্টালটি গড়ে তুলেন। ইন্টারনেটে বাংলা ভাষায় মেয়েদের জন্য সহায়তামূলক লেখালেখি ও কম্যুনিটির যে অভাব ছিল, মায়া সে শূন্য স্থান পূরণে দারুণ ভূমিকা রেখে চলেছে।

সাদেকা রহমান সেজুঁতি: আমার দেশ আমার গ্রাম এর প্রতিষ্ঠাতা

সাদেকা আমার দেশ আমার গ্রাম নামের উদ্যোগটি প্রতিষ্ঠা করার জন্য তার স্থাপত্যবিদ্যার ক্যারিয়ার ছেড়ে আসেন। এই প্রকল্পের মূল উদ্দশ্যে হলো প্রান্তিক জনগোষ্ঠির জন্য একটি ই-কমার্স প্লাটফর্ম বানানো, যাতে তারা দারিদ্রসীমা থেকে বের হয়ে আসতে পারে। আমার দেশ আমার গ্রাম প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সেবাকে গ্রাম পর্যায়ে নিয়ে যান এবং তাদের তথ্যের সমুদ্রের সাথে সংযুক্ত করেছেন, যা আগে ছিল দুর্লভ।
বর্তমানে এই প্রকল্পের সাইটে গ্রামীণ কৃষক উৎপাদিত ফসল ও অন্যান্য জিনিসপত্রকে প্রাধান্য দিয়ে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। তাদের এই ব্যতিক্রমী কাজের জন্য এরমাঝেই আমার দেশ আমার গ্রাম প্রকল্প বেশি কয়েকটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে। তবে একটি টেকসই ব্যবসা হিসেবে এই চমৎকার উদ্যোগটি টিকে থাকতে গেলে আরো অনেক কিছু করতে হবে।

মালিহা এম কাদির: প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সহজ ডট কম

সহজ ডট কম হলো দেশের প্রথম ও সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অনলাইন টিকেট কাটার ওয়েবসাইট। ২০১৪ সালে চালু হওয়া এই প্লাটফর্মটি ফেনক্স ও সিংগাপুরের সেনজেল ভেঞ্চার থেকে ভেঞ্চার ফান্ড নিয়ে কাজ শুরু করে। মূলত বাস ও লঞ্চ বুকিং সেবা দিয়ে শুরু করলেও মালিহা সম্প্রতি সহজ ডট ক-এ হোটেল বুকিং এর সেবাও চালু করেছেন। সম্প্রতি দেশে নতুন কয়েকটি টিকেটিং সেবাদাতা তাদের সেবা চালু করেছে। সহজ ডট কম-এর জন্য এরা প্রতিযোগিতার আভাস দিলেও বাংলাদেশের বাজার কয়েকটি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ধারণ করার মত বেশ বড়।
ডিজিটাল পরিসেবা ও ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিং এ মালিহার রয়েছে অনেক বছরের অভিজ্ঞতা। সিংগাপুর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন সম্ভাবনাময় বাজারে তিনি ভিস্তাপ্রিন্ট এর হয়ে ব্যবসা পরিচালনা করেছেন। সহজ ডট কম শুরু করার আগে তিনি মর্গান স্ট্যানলি (নিউইয়র্ক), স্টান্ডার্ড চার্টাড ব্যাংক (সিঙ্গাপুর), ভিস্তাপ্রিন্ট ও নকিয়া’য় কাজ করেছেন। আমাদের জানামতে সহজ ডট কম বেশ ভাল ভাবে শুরু করেছে। তবে এই উদ্যোগটিরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।

আমাদের এই তালিকা অসম্পূর্ণই বলা চলে। আপনার আশেপাশে এমন কেউ কি আছে যিনি অসাধারণ সব উদ্যোগ নিয়েছেন? মন্তব্যের ঘরে আমাদের জানান।
এই তালিকাটি ফিউচার স্টার্টআপের রুহুল ও নেজামের যৌথ উদ্যোগে লিখিত। সম্পাদনা করেছেন মাহফুজ মানিক।