এ বছর অক্টোবরের ২০ তারিখ কনজিউমার রিপোর্টস তাদের ‘পছন্দের গাড়ির’ তালিকা থেকে টেসলা মোটর্সের মডেল এস গাড়িটি বাদ দেয়। আপনি হয়তো জানেন, টেসলা হলো এলন মাস্কের গাড়ি প্রস্তুতকারক কোম্পানি। একসময় কনজিউমার রিপোর্টস এর পছন্দের তালিকায় শীর্ষে থাকা ‘বেস্ট পার্ফমার’ গাড়িটি নিয়ে তাদের এখনকার বক্তব্য হলো, এটি ‘গড়পড়তা মানের চেয়েও খারাপ’। তবে একে এখনও টেসলার জন্য বিশাল ধাক্কা বলা যাবে না। কারণ তাদের এই গাড়ির ক্রেতারা সাধারণত দুই বা তারও অধিক গাড়ির মালিক, যাদের কাছে মডেল এস হলো শখের গাড়ি। টেসলার গাড়ি কাজ না করলে সমস্যা নাই, অন্য গাড়ি তো আছেই।

যাই হোক, টেসলা তাদের নতুন গাড়ি মডেল ৩ নিয়ে কাজ করছে। যেটা আগামী বছরের মার্চ নাগাদ বাজারে আসার কথা রয়েছে। গাড়িটি নিয়ে তারা উচ্চাশায় বুক বেঁধেছে। টেসলা নিশ্চিত ৩৫ হাজার ডলার দামের এই গাড়িটি মূলধারার গাড়ির বাজার বাজিমাত করবে। এই বাজেটের গাড়ির ক্রেতারা সাধারণত একটাই গাড়ির মালিক। স্বাভাবিকভাবেই তারা তাদের একমাত্র গাড়ির উপর পুরোপুরি নির্ভর করে। প্রশ্ন হলো, টেসলা যদি তাদের বর্তমান শৌখিন ক্রেতাদের সন্তুষ্ট করতে না পারে তবে কম বাজেটওয়ালা ক্রেতাদের কি সন্তুষ্ট করতে পারবে? এর উত্তর পেতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। তবে খবর বলছে- টেসলার শেয়ারের ৭ শতাংশ দরপতন ঘটেছে।

প্রসঙ্গত, প্রতিবছর নেভাদার মরুভূমিতে ‘বার্নিং ম্যান’ নামে একটা জমায়েত হয়। ২০০৪ সালের জমায়েতে ৩০ ফুট উচু একটা গাছের গুড়ি স্থাপন করে লোকজন, যার উপর নাচানাচি করার মতো একটা ছোট জায়গাও ছিল। কয়েক ডজন লোক এই গুড়িটা বেয়ে উঠতে গিয়ে ব্যর্থ হয়। তখন নতুন একজন এই আরোহন অভিযানে আগ্রহ প্রকাশ করে। সবাই ভ্রু কুঁচকে দেখল, লোকটির ৩০ ফুট বেয়ে উপরে উঠতে পারার কোন সম্ভাবনাই নেই। তারপরও সে উঠতে থাকে। পুরো সময়টা সে আনাড়ির মতো গুড়িটি জড়িয়ে ধরে থাকে এবং ইঞ্চি ইঞ্চি করে উপরে উঠতে থাকে। তার অদম্য চেষ্টা তাকে ৩০ ফুট উচ্চতায় নিয়ে যায়।

লোকটা আর কেউ নন। এলন মাস্ক!

এলন মাস্ককে নিয়ে অ্যাশলি ভিন্সের লেখা বায়োগ্রাফিতে এরকম আরও অনেক গল্প আছে। এই গল্প গুলো পড়লে দেখবেন কিভাবে মাস্ক পেপাল থেকে চাকরি হারানো ঠেকাতে যুদ্ধ করেছেন; ম্যালেরিয়ায় মরতে মরতে বেঁচে গেছেন এবং আপনার মন্তব্য হবে হয়তো তার এই অদম্য চেষ্টাই টেসলাকে বর্তমান অবস্থা থেকে বাঁচাবে।

তবে আপনার এই উপসংহারে একটু গ্যাপ আছে, যেটা এলন মাস্কের চরিত্রের সবচেয়ে বড় দিক।

আমার ১৭ মাস বয়সি মেয়ের প্রিয় বই হলো অলিভার জেফারের লেখা “দিজ মুজ বিলংজ টু মি”। বেশ মজার রূপকথার বইটি। যেখানে উইলফ্রেড নামের এক ছোট্ট বালক বনে একটা শিংওয়ালা হরিণ খুঁজে পায়। তাকে নিজের পোষা প্রাণী হিসেবে ভাবতে থাকে। উইলফ্রেড এর নাম দেয় মার্সেল এবং তাকে ভাল পোষা প্রাণী হবার বিভিন্ন দিক শেখাতে থাকে। সমস্যা হলো, মার্সেল ছাত্র হিসেবে আংশিক ভাল; যেমন সে উইলফ্রেডকে বৃষ্টি থেকে বাঁচায়, তার নাগালের বাইরের গাছের ডালে চড়তে সাহায্য করে। বাকি বিষয়গুলো মেনে চলার ব্যাপারে মার্সেল কম আগ্রহী। যেমন, সে উইলফ্রেডের বাড়িতে বা আশেপাশে থাকে না। তাই খেলার সময় উইলফ্রেড ও মার্সেল পথে চিহ্ন রেখে যায়, যাতে ফেরার সময় উইলফ্রেড পথ হারিয়ে না ফেলে।

একদিন খেলতে খেলতে তারা দুজন উইলফ্রেডের বাড়ি থেকে অনেক দূরে বনের গহীনে চলে যায়। সেখানে তারা এক মহিলার দেখা পায়, যে মার্সেলকে দেখা মাত্র ডাক দেয়, “রড্রিগো!”

উইলফ্রেড দেখল, মহিলা মার্সেলকে তার পোষা প্রাণীর মতো মনে করছে। এতে সে বেশ ভয় পেয়ে যায়। ‘এটা তো তার পোষা না, এর নাম মার্সেল এবং এটা শুধুই আমার!’ উইলফ্রেড ভাবে। তবে মার্সেল আনন্দের সাথে মহিলার কাছে গিয়ে তার দেয়া আপেল খেতে থাকে। উইলফ্রেড বাঁধা দেয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। অবশেষে রাগে গজরাতে গজরাতে বাড়ির দিকে রওনা দেয়। অতিরাগে সে তার রেখে যাওয়া পথের নিশান মাড়িয়ে বনের মাঝে পথ হারিয়ে সে দিশেহারা হয়ে পড়ে। এদিকে রাত হয়ে যাচ্ছে। বনের মাঝে রাত মানে অনেক মন্দ কিছু ঘটার সম্ভাবনা। উইলফ্রেড ভয়ে কাতর।

তবে মার্সেল উইলফ্রেডকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসে এবং তাকে পিঠে করে বাড়ি পৌঁছে দেয়। অবশেষে উইলফ্রেড বুঝতে পারে যে, সে কখনোই হরিণটির আসল মালিক হতে পারেনি। তাই সে এর সাথে একধরনের চুক্তিতে পৌঁছায়:
“মার্সেল উইলফ্রেডের সব নিয়ম মানবে, যদি সেটা তার জন্য সুবিধাজনক হয়।”
অবশেষে উইলফ্রেড একটা বন্য হরিণের সাথে তার বন্ধুত্বের অপেক্ষাকৃত ভাল দিকটি দেখতে পেল। তাই নিজের সীমিত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে লেগে থাকার বদলে সে শিখল কিভাবে নিজেকে অবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হয়। প্রথমে সে শিখল কিভাবে পরিপার্শ্বিকতার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হয়। মার্সেলের তার বাসায় থাকতে না চাওয়ায় সে পথ খুঁজে পেতে পথে নিশান রেখে যেত। কিন্তু এতটুকুই যথেষ্ট ছিল না। যেহেতু উইলফ্রেড হরিণটির ইচ্ছাকে বদলে দিতে পারছিল না, তাই সে জোর করে একে শেখানোর চেষ্টা বাদ দিল। একটু পিছিয়ে এসে সে পুরো পরিস্থিতি বুঝার চেষ্টা করলো, এবং নিজেকে পরিবর্তিত অবস্থার সাথে মানিয়ে নিল।

এলন মাস্কের অন্যান্য ব্যবসাগুলোর সাথে আমাদের পরিচয় আছে। এরমাঝে “স্পেস এক্স” বেশ পরিচিত। রকেট বানিয়ে মানুষকে মঙ্গলে পাঠানো, এটা হল মাস্কের চিন্তা। তবে অনেকেই হয়তো জানেন না, স্পেস এক্স নিয়ে মাস্কের প্রথমদিককার চিন্তা ছিল মঙ্গলে ইঁদুর পাঠিয়ে তাদের বংশবৃদ্ধি করানো।

যখন মাস্ক বুঝল পুরো ব্যাপারটার খরচ বিশাল ও গবেষনার বাস্তব দাম কম, তখন সে তার চিন্তা বাস্তবতার সাথে খাপ খাইয়ে নিল। সে বলল, স্পেস এক্স চেষ্টা করবে একটা গ্রীনহাউজ মঙ্গলে পাঠিয়ে কিভাবে প্রতিকূল পরিবেশে চাষাবাদ করা যায় তা নিয়ে গবেষণা করা। সে মহাকাশে গ্রীনহাউজ পাঠানোর নতুন লক্ষ্যে কাজ শুরু করল। কিন্তু এপথেও বাধা অনেক।

রাশিয়া ছিল তখন রকেট উৎক্ষেপনের সবচেয়ে ভাল জায়গা। রাশিয়ানরা এটা ভালমতোই জানত। তাই তারা এই মনোপলির সুবিধা নিতে বিশাল দাম হাঁকিয়ে বসল। এই বিপত্তির মুখে মাস্ক বুঝল, তার চিন্তা বেশ ক্ষণদৃষ্টিসম্পন্ন। সে আসলে মানুষকে মহাকাশে পাঠাতে চায় এবং এই চিন্তায় সে তার আগের সব প্রজেক্ট বাদ দেয় এবং রকেট বানানো শুরু করে। কিন্তু রকেট বানাতে তো অনেক টাকা লাগে! তাই সে স্পেসএক্সকে আরেকটু বদলে দিল, যাদের মহাকাশে ছোটখাট উপগ্রহ বা অন্যকিছু উৎক্ষেপনের দরকার হয়, স্পেসএক্স তাদের সেবা দেয়া শুরু করে।

সমস্যা হলো, এই ব্যবসাতেও যথেষ্ট টাকা নেই যা দিয়ে কোম্পানিটি সচল রাখা যায়। মাস্কের ভাষায়: স্পেসএক্স এর সাথে আমার বেশ আবেগ জড়িত। এজন্য আমি বেশ হতাশ ছিলাম, কারণ আমি ভেবেছিলাম, বানের পানির মতো অর্ডার পাবো, অথচ আট বছরে একটাও অর্ডার পেলাম না।

তাই আবারও খাপ খাইয়ে নেয়া। এখন স্পেসএক্স বড় রকেট বানায়। তারা এখন চেষ্টা করছে মহাকাশে নিজস্ব টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক বানাতে।
মাস্কের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট হলো সে কোন ছোট লক্ষ্য নিয়ে পড়ে থাকে নি, বরং একটা বড় লক্ষ্যের পানে ছুটতে গিয়ে আশেপাশের সবকিছু এবং এর সঙ্গে নিজেকেও বদলে নিয়েছে।

গাপ্পি মাছ ও একুরিয়ামের গল্পটাও তেমন। পরিষ্কার পানির একুরিয়ামে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় গাপ্পি মাছ। একুরিয়ামে এদের দারুণ দেখায়, কারণ তারা বেশ রংচঙে। এদের সারা দুনিয়ায় সব বন্য পরিবেশে পাওয়া যায়।

হয়তো আপনি চিন্তায় পড়ে যাবেন, কিভাবে এই ছোট্ট সুন্দর মাছ বন্য পরিবেশে টিকে থাকে! এরা আকারে বড় না, এদের কোন বিষাক্ত অস্ত্র বা কৌশলও নেই। আচ্ছা, তাদের উজ্জল রঙ কি তাদের সহজ শিকারে পরিণত করে না?
বিবর্তনবাদি জীববিজ্ঞানি জন এন্ডলার ১৯৭০ সালে ত্রিনিদাদে গাপ্পিদের নিয়ে দারুণ এক আবিষ্কার করেন। সেখানে তিনি এসংক্রান্ত একটা গবেষণা করছিলেন। তিনি দেখলেন, একই পানিতে বসবাসকারি গাপ্পিদের মাঝে দারুণ বৈচিত্র।
তিনি তাদের আরো কাছ দেখে বুঝলেন, পানির উপরের স্থরে থাকা গাপ্পিরা উজ্জল ও চকচকে, এবং ঝরনার পানি প্রবাহ তাদের শিকারিদের হাত থেকে বাঁচায়। পানির নিচের স্তরে, যেখানে ঝরনার পানির স্রোত নেই বললেই চলে, সেখানে গাপ্পিদের রং মেটে, অনেকটা সমুদ্রের তলদেশের কর্দমাক্ত পরিবেশের সাথে মিলে যায়।

একই জলাধারের মাঝে তিনি বিবর্তন খুঁজে পেলেন, যেটা খুব অস্বাভাবিক, কারণ বিবর্তন সাধারণত অনেক বছরের পরিক্রমায় দৃশ্যমান হয়। তাই তারা বেশ চমকিত হলেন। তিনি ও তার সহকর্মীরা ল্যাবের সীমিত পরিবেশে দেখাতে চাইলেন বিবর্তন কিভাবে কাজ করে। তারা প্রথমে জলাধারের পরিবেশ তৈরি করলেন এবং গাপ্পিদের সেখানে ছেড়ে দিলেন। এরপর যখন তিনি সেই পুলে শিকারি মাছ ছেড়ে দিলেন এই আশায় যে, হয়তো উজ্জল গাপ্পিগুলো বেশ তাড়াতাড়ি নিজেদের রঙ বদলে মেটে রঙে পরিণত হবে এবং ল্যাবের পুল বানানোর উপাদানের সাথে নিজেদের এমনভাবে খাপ খাইয়ে নেবে যাতে তারা শিকারিদের ফাঁকি দিতে পারে।

কিন্তু সেরকমটা ঘটল না। কোন একক গাপ্পি মাছ বিবর্তিত হয় না, বরং পুরো গাপ্পির ঝাঁক বিবর্তনে অংশ নেয়। যেখানে শিকারি উজ্জল গাপ্পি খায়, সেখানে মেটে রংয়ের গাপ্পি বেঁচে থাকে এবং তাদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এরমানে দাড়ালো, গাপ্পিরা এককভাবে নিজেকে বদলে নিতে পারে না, বরং তারা দলগতভাবে টিকে থাকে বা বিলুপ্ত হয়ে যায়।

তবে টেসলার ভবিষ্যত কি এটা নিয়ে এখনই মন্তব্য করা কঠিন। যদি আপনি তাদের কাজকারবার ভাল মতো লক্ষ্য করেন, দেখবেন তারা শুধু গাড়ি বানানোতেই থেমে নেই, তারা ব্যাটারিও বিক্রি করে। তারা টয়োটা ও ডাইমলারের মতো বড় কোম্পানিগুলোর কাছে গাড়ির পার্টস বিক্রি করে। তারা আগামী দিনের “গ্যাস স্টেশন” বানাচ্ছে, হয়তো তারা নিজেদের বর্তমান ব্যবসা ছেড়ে ‘এনার্জি’ ব্যবসাতে চলে যাবে। হয়তো তারা তাদের কারখানাগুলোকে বিশাল সৌরবিদ্যুতের দোকানে পরিণত করবে।

এখন মানুষের কাছে নির্ভরযোগ্য কোম্পানি হিসেবে হারানো সুনাম ফিরে পেতে এলন মাস্ক নিশ্চিতভাবে নিজেকে বদলে ফেলবেন। আপনি আশ্চর্য হবেন না যদি শুনেন যে টেসলা গাড়ি বানানো বাদ দিয়ে অন্যদের বৈদ্যুতিক গাড়ি বানানোর তালিম দিচ্ছে। হতে পারে এটাই বৃহত্তর লক্ষ্য।

শত বাধা বিপত্তির মাঝে এলন যুদ্ধ করে যায়। আবার সে দ্রুত হাল ছেড়ে পথ পরিবর্তনও করে। নিজেকে মানিয়ে নেয়। কোন কিছু যদি তার পথ আগলে দাড়ায়, তবে সেটার সাথে জান লড়িয়ে মারামারি করার বদলে সে একটু পিছিয়ে এসে দেখতে চেষ্টা করে কি ঘটছে এবং নতুন কোন সুযোগ তৈরি হয়েছে কি না। সে নিজেকে এরজন্য প্রয়োজনীয়ভাবে বদলে নেয়। নিজেকে আগের চেয়ে বেশি সুযোগ এনে দেয়।

কারণ, আমরা গাপ্পি মাছ না, আমরা বিজ্ঞানীর জাত।

লেখক: ন্যাথান কন্টনি, অনুবাদ: নেজাম উদ্দীন, সম্পাদনা: মাহফুজ মানিক।