সব কোম্পানিই তার ক্রেতা দের কে ‘অত্যধিক খুশি’ করার চেষ্টা করে। আর এই ‘অত্যধিক খুশি’ করার ব্যাপার তা এখন এতো বেশি ‘myopic’ হয়ে গেছে যে কেউ ‘অত্যধিক খুশি’ করার বিষয়টা আর তলিয়ে দেখতে চায়না। কিন্তু নিজেই ভেবে দেখুনঃ ঠিক কতটুকু লাভ হবে যদি আপনি আপনার সব ক্রেতাকেই সমান ভাবে খুশি করতে চান? অথবা ঠিক কতজন ক্রেতা আপনার কোম্পানির ‘over-the-top service’ এর কারনে সব সময় বেশি বেশি করে পণ্য কিনবে অথবা সেবা নিবে? আপনি হয়ত কয়েকটা উদাহরণ দিতে পারেন, যেমন আপনি কোন একটা রেস্তোরাঁতে সব সময় খাবার খেতে যান তাদের ভাল সেবার কারণে। আপনি কি প্রতিবার আপনার খাওয়ার মাত্রা বাড়িয়ে দেন? না, আপনি ঠিক একই পরিমাণ খাবার গ্রহণ করেন।

এবার আরেকটি বিষয় চিন্তা করুনঃ ঠিক কতগুলো কোম্পানি তাদের বাজে সেবার কারণে ক্রেতা হারিয়েছে? আপনি আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন খাবারের দোকান এর কথা ভাবুন। তাহলেই উত্তর পেয়ে যাবেন। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে খারাপ সেবাদান অবশ্যই একটা কোম্পানিকে বিপদের মধ্যে ফেলে। যেমনঃ আপনি হয়তো দ্বিতীয় বার কোন বাস এ ভ্রমন করবেন না যে বাস কোম্পানি আপনার মালামাল হারিয়ে ফেলে। ক্রেতারা সবসময় ‘বাজে সেবাদান’ করা কোম্পানি গুলো কে ‘শাস্তি’ দেওয়ার চিন্তা করে। তাই একটা কোম্পানির উচিত হবে, ‘over-the-top’ সেবা দান না করে ‘core service’ টা দেওয়া অথবা ক্রেতাদের সমস্যার সহজ সমাধান দেওয়া। এতে করে আপনার লাভ অনেক, ক্ষতি অনেক খানি কম। উন্নত সেবা দান এর জন্য আপনার যেমন বেশি খরচ করতে হচ্ছে না, তেমনি খারাপ সেবা দান না করার কারণে আপনার ক্রেতাও বিমুখ হচ্ছে না।

Customer Contact Council এর Matthew Dixon এবং তার কয়েকজন কর্মকর্তা (২০১০) মিলে গবেষণা করে দেখতে চেয়েছেন কোন কোম্পানির সেবদানের সাথে ক্রেতাদের বিশ্বস্ততার কতটুকু সম্পর্ক রয়েছে। বিষয়টি পরীক্ষা করার জন্য তারা বিভিন্ন মাধ্যমে আমেরিকার প্রায় ৭৫,০০০ ক্রেতার মতামত নিয়েছেন। মতামত নেওয়া হয়েছে ৩ টি বিষয়েঃ
১। কোন কোম্পানির প্রতি অনুগত হওয়ার জন্য তাদের সেবাদানের গুরুত্ব কতটুকু?
২। কোন ধরনের সেবাদান (পদ্ধতি) একটা ক্রেতাকে কোন কোম্পানির প্রতি অনুগত করে এবং কোন গুলো করে না?
৩। কোন কোম্পানি কি তাদের সেবা দানের মাত্রা অথবা সেবার দানের খরচ না বাড়িয়ে ক্রেতাদের বিশ্বাস অর্জন করতে পারে?

দুটো বিষয় এই গবেষণা থেকে বেরিয়ে আসেঃ
১। ক্রেতাকে ‘খুব খুশি’ করার মাধ্যমে বিশ্বস্ততা জন্মায় না, কিন্তু ক্রেতাদের সমস্যা সমাধান করার মাধ্যমে বিশ্বস্ততা জন্মায়।
২। ১ নং এর আলোকে সেবাদান করলে কোম্পানির সেবাদান ভাল হয়, সেই সাথে খরচ এবং ক্রেতা হারানোর মাত্রাও কমে যায়।

আমরা মার্কেটিং এ পড়েছি, ক্রেতাকে অবশ্যই ‘Delight’ করতে হবে। আমরা Service Dimensions এও পড়েছি, ক্রেতাকে কি পরিমাণ সেবা দিলে ক্রেতা বিরক্ত হবে অথবা অত্যধিক খুশি হবে। এই বিষয় গুলো পুরোপুরি বইয়ের মদ্ধেই সীমাবদ্ধ। Customer Contact Council এর গবেষণা তাই প্রমান করে। যেসব সেবাদান কোম্পানি তাদের অধিকাংশ অর্থ অত্যধিক সেবাদানের জন্য ব্যবহার করছে, সেই সব কোম্পানির জন্য এই বিষয় তো গুরুত্বপূর্ণ।

Matthew Dixon (২০১০) তার গবেশনায় ৫ টি কৌশল এর উল্লেখ করেছেন, যেগুলো ব্যাবহার করে একটা কোম্পানি ক্রেতাদের বিশ্বস্ত হতে পারে। কৌশল গুলো নিম্নরূপঃ

১। শুধুমাত্র বর্তমান সমস্যা সমাধান না করে পরবর্তী সমস্যার দিকে নজর দিন
Matthew Dixon দেখিয়েছেন আমেরিকা তে প্রায় ২২% ফোনকলই করা হয় ক্রেতাদের আগের সমস্যা নিয়ে কথা বলার জন্য। যদিও কোম্পানি ক্রেতার সাথে সরাসরি তার সমস্যা নিয়ে কথা বলেছেন, পরবর্তীতে ফোন করে আলোচনা করাটা ‘এক কাজ দুই বার করে করার মতই’ হয়ে যায়। প্রতিটি কোম্পানির উচিত পরবর্তী সমস্যা সমাধানের দিকে নজর দেওয়া।

২। ক্রেতাদের ‘emotional’ দিক গুলোর প্রতি নজর দিন
যুক্তরাজ্যের একটি কোম্পানি তার কর্মীদেরকে ক্রেতাদের ‘personality’ অনুযায়ী সমাধান দেওয়ার প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। কোন কর্মী ক্রেতাকে ফোন করে প্রথমে ঐ ক্রেতার ‘personality’ যাচাই করার চেষ্টা করে, এবং সেই অনুযায়ী ঐ ক্রেতাকে সেবাদান করে থাকে। যদি গৎবাধা ভাবে সব ক্রেতা কে একই সেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হয় তাহলে ক্রেতারা ‘বিরক্ত’ অথবা ‘বিশ্বাস’ হারিয়ে ফেলতে পারে। ক্রেতাদের ‘emotional’ বিষয় গুলো বিবেচনা করে সেবাদান করলে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

৩। কোম্পানির ‘self-service’ চ্যানেল গুলোকে উন্নত করুন
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোন কিছু কেনার আগে ক্রেতারা কোম্পানির ওয়েবপেজ এর খোঁজ করেন। যদি ক্রেতা বিশ্বস্ত কোন তথ্য ওয়েবপেজ এ খুঁজে না পান তাহলে প্রথম যে কাজটি করেন তা হলঃ ঐ কোম্পানির কর্মীকে ফোন করে কোন বিষয় জেনে নেওয়া। এতে করে ক্রেতারা বিরক্ত হচ্ছেন, কর্মীদের পিছনেও অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই কোম্পানি তার এই ‘self-service’ চ্যানেল গুলোকে গুরুত্ব দেন না। হয়তো ভাবেন, ক্রেতা তো আছেই। এই ধরনের বিষয় গুলো ক্রেতা দের বিশ্বাস কে নষ্ট করে দিতে পারে। তার আগেই কোম্পানির উচিত এই ধরনের চ্যানেল গুলোকে ক্রেতা দের উপযোগী করে তোলা। সহজ অর্থে – সেবাদানকে ‘সহজ’ রাখা।

৪। অসন্তুষ্ট ক্রেতাদের বক্তব্য শুনুনঃ কিভাবে সেবা দিবেন? কি করলে অসন্তুষ্ট হবেন না?
প্রথমেই জেনেছি ক্রেতাদেরকে অতি মাত্রাই খুশি করলেই সবকিছু পাওয়া হয়ে যায় না। অসন্তুষ্ট ক্রেতাদের বক্তব্য কোন কোন ক্ষেত্রে সেবাদানের ‘আসল’ অবস্থাকে তুলে ধরতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার একটি কোম্পানি এই বিষয়ে একটি ভাল কৌশল ব্যবহার করে। যে সব ক্রেতা কোম্পানিতে সেবাদানের খারাপ অবস্থা নিয়ে অভিযোগ করেছে, সেই সব ক্রেতদেরকে কোম্পানিটি ফোন করে জানার চেষ্টা করে কিভাবে সেবাদানের অবস্থা উন্নত করা যায়। সেই সব ক্রেতাদের থেকে পাওয়া তথ্য কাজে লাগিয়ে কোম্পানিটি তার সমস্যা সমাধানের যোগ্যতা কে ৩১% পর্যন্ত বৃদ্ধি করছে।

৫। কোম্পানির ‘সামনের’ কর্মীদের কে ‘ক্ষমতা’ প্রদান করা
ধরুন, একজন ক্রেতা আপনার কোম্পানি থেকে একটা মোবাইল কিনেছেন। ক্রেতাটি বাসায় গিয়ে দেখলেন মোবাইল টি কাজ করছে না। যে কর্মীর থেকে ক্রেতা মোবাইল টি কিনেছিলেন তাকে বিষয়টা জানানোর পর ঐ কর্মী লাইন ম্যানেজার এর কাছে জানতে এসেছেন, ফোন টি ‘replace’ করে দেওয়া যাবে কিনা? যদি ঐ কর্মী কেই মোবাইলটি পরিক্ষা করে পরবর্তীতে replace’ করে দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হত, তাহলে অতিরিক্ত সময় খরচ করার প্রয়োজন পড়ত না।

প্রতিটি কোম্পানিরই উচিত কিভাবে একজন ক্রেতার পিছনে কম সময় খরচ করা যায়। তবে সেই সময় কমানোটা অবশ্যই ক্রেতাকে অখুশি করে না।

সুত্রঃ হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ