april-7-2012-article-imag-11-300x225বেশ কিছুদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সংগঠনের আয়োজিত একটা অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। অনুষ্ঠানে একজন বক্তা- একসময় জাতীয় পর্যায়ে সেরা বিতার্কিক ছিলেন, এখন চার্টাড একাউন্ট্যান্ট,একটা মূল্যবান কথা বললেন।কথাটা এরকম-“কেন আমরা সংগঠন করি? এরকম অনেকেই আছেন যারা নিজেরা অনেক কিছুই জানেন।কিন্ত কিছু মানুষের মধ্যে বা অনেক মানুষের মধ্যে সেই জ্ঞানটুকু যদি কার্যকরভাবে ছড়িয়ে দেয়া না যায় তাহলে সেই জ্ঞান আদতে কোনো কাজে আসে না।”জ্ঞান যখন মানুষের কাজে লাগবে,মানুষের উন্নয়নের পথ বাতলে দেবে তখনই জ্ঞানের সার্থকতা।চিন্তালব্ধ জ্ঞান যখন মানুষ তার উন্নয়নের কাজে লাগাতে চায় তখনই প্রয়োজন হয় সংগঠনের।তখন মানুষকে কাজ করতে হয় দলবদ্ধ হয়ে।

বর্ষীয়ান অর্থনীতিবিদ ডঃ রেহমান সোবহান এক সাক্ষাতকারে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, বাংলাদেশে দারিদ্র্য নিয়ে অনেক গবেষণা করা হয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচনের অনেক সমাধান দেওয়া হয়েছে।তার সিকিভাগও নাকি বাস্তবায়িত হয় নি।তাই গবেষণাগুলো তেমন কোনো কাজে আসে নি।যখনি আমরা কোনোকিছু কার্যকরভাবে ছড়িয়ে দেয়ার কথা ভাবব তখনি আমাদের  একটা সাংগঠনিক পরিমণ্ডলের মধ্য দিয়ে যেতে হবে,সাংগঠনিক ক্ষমতা অর্জন করতে হবে।পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পর্যন্ত সব জায়গায় এই কথাটি প্রযোজ্য।

সাংগঠনিক ক্ষমতা বলতে কোন একটি বিষয় বাস্তবায়নে সমমনাদেরকে একত্রিত করা,বিষয়টির কার্যকারিতা সম্পর্কে তাদেরকে স্পষ্ট ধারণা দেয়া এবং সংগঠনের সবাইকে একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যাওয়াকেই বোঝায়।এখানে স্যামসন এইচ চৌধুরী আর স্কয়ার গ্রুপের উদাহরণ টানা যায়। একটা ফার্মেসি দিয়ে শুরু করে স্যামসন এইচ চৌধুরী স্কয়ারকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একটি বিজনেস কংলোমারেটে পরিণত করেছেন।বাংলাদেশের গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে বিভিন্ন অনিয়মের কারণে শ্রমিক অসন্তোষ বেড়েই চলেছে। মিডিয়াতেও এই ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে নেতিবাচক একটা ইমেজ তৈরি হয়েছে।কিন্তু স্কয়ার সেখানে আলাদা।সেখানে শ্রমিক অসন্তোষ বলতে কিছু নেই।তারা শ্রমিকদের সংগঠনের একটা গুরুত্বপূর্ণ ফোর্স হিসেবেই দেখে।তাদের ভালোমন্দ সবসময় আগে থেকেই ভেবে রাখে এবং প্রয়োজনের সময় ব্যবস্থা নেয়।তারা শ্রমিক সহ অন্যান্য ফোর্সগুলোকে এমন ভাবে পরিচালিত করে যাতে তারা সহজেই তাদের নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেন।ব্যবসায়ে অনাকাঙ্খিত ঘটনা থাকবে এটাই স্বাভাবিক।কিন্তু সাংগঠনিক ক্ষমতা দিয়ে সেটাকে যতটা কমিয়ে আনা যায় ততই সফলতার দিকে এগিয়ে যাওয়া যায়।

সংগঠনে মতবিরোধিতা খুব স্বাভাবিক একটি ব্যাপার।বিরুদ্ধমতগুলোকে সম্মান দিতে শেখা,সেগুলোকে যুক্তির বিচারে বিবেচনা করার ক্ষমতা থাকতে হবে। বিরুদ্ধমতগুলো সবসময় একটি সিদ্ধান্তকে আরো যাচাই-বাছাই করার সুযোগ করে দেয়।কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নয় বরং সবচেয়ে কার্যকর মতকে প্রাধান্য দেয়ার সংস্কৃতি ধারণ করতে হবে ।

প্রতিটি সংগঠনের একটি নিজস্ব সংস্কৃতি থাকে।বহুদিন ধরে চর্চা করার ফলে তার একটি ব্যাখ্যা করার মত রূপ দাঁড়ায়। সংগঠনের মতাদর্শ,মূল্যবোধ,উন্নয়ন-দর্শন, সংগঠনের কাজ করার পদ্ধতি,বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃত্বের মধ্যে সম্পর্কের ধরণ-এরকম আরো অনেক বিষয় সাংগঠনিক সংস্কৃতির আলোচনার মধ্যে পড়ে।এখানে  সাংগঠনিক মূল্যবোধ সম্পর্কে একটি কথা না বললেই নয়।একটি সংগঠনে অনেক ধরনের মানুষ থাকে।তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব মূল্যবোধ রয়েছে,ভালো-মন্দ বিচারের আলাদা একটা মাণদণ্ড রয়েছে।কিন্তু সংগঠন একটি আলাদা সত্তা।তার নিজস্ব একটা মানদণ্ড থাকবে এবং সংগঠনের প্রত্যেকের উচিত নিজের ভালো-মন্দ বিচারের মানদন্ডটি সংগঠনের মানদণ্ডের সাথে মিলিয়ে নেয়া।তাদের উচিত সংগঠন যে রকম ব্যবহার আশা করে ঠিক সেভাবেই কাজ করা।এই যে অনুগত থাকা- সংগঠনের সফলতার জন্য এটি খুব জরুরি।চীনারা তাদের পরিবারের প্রতি প্রবলভাবে অনুগত থাকে তাদের কনফুসীয় মূল্যবোধের কারণে।এ কারণে চীনে পরিবারভিত্তিক ব্যবসা সবসময় সফল হয়।

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার একবার এরকম একটা কথা বলেছিলেন যে,বাঙালি জাতির গর্ব করার মত সাংগঠনিক ইতিহাস নেই বললেই চলে।দুর্নীতি,স্বজনপ্রীতি, ব্যক্তিগত রেষারেষি দিয়ে জর্জরিত বাংলাদেশের বেশিরভাগ সংগঠন। সাংগঠনিক লক্ষ্যের ব্যাপারে যথেষ্ট পরিমাণে আন্তরিক না হলে এই সমস্যাগুলো থেকে বের হওয়া কঠিন। সত্যিকার অর্থে বড় কিছু করতে হলে সুস্থ সাংগঠনিক চর্চা , একটা সুস্থ সাংগঠনিক সংস্কৃতির মধ্য দিয়েই সেটা করতে হবে-এর কোনো বিকল্প নেই।