image_456_82998বাংলাদেশের দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত করতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গুরুত্ব্পূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এ খাত আমাদের সিংহভাগ লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে এবং প্রকৃতপক্ষে বেসরকারি খাতের ভিত্তিপ্রস্তর রচনা করে।

এখন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের এরিয়াকে নির্দিষ্ট করতে এর সংজ্ঞা নিরুপণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের শিল্পনীতি ২০১০ অনুসারে ম্যানুফ্যাকচারিং এর ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র শিল্পের মোট সম্পদের মূল্য ৫০ লাখ থেকে ১০ কোটির মধ্যে হতে হবে( জমি ও বিল্ডিং এর মূল্য বাদে)। অথবা শ্রমিকের সংখ্যা ২৫-৯৯ জনের মধ্যে হলে সেটাকে ক্ষুদ্র শিল্প বলা যাবে। সেবা খাতে ৫ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা সম্পদ সম্পন্ন এবং ১০-২৫ জন শ্রমিক কাজ করে এমন প্রতিষ্ঠানকে ক্ষুদ্র শিল্প বলা যাবে।অন্যদিকে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে ১০-৩০ কোটি টাকার সম্পদ সম্পন্ন (জমি এবং বিল্ডিং এর মূল্য বাদে ) এবং শ্রমিক সংখ্য ১০০-২৫০ জনের মধ্যে- এমন প্রতিষ্ঠানকে মাঝারি শিল্প বলা যাবে। সেবা খাতের ক্ষেত্রে মোট সম্পদের মূল্য ১-১৫ কোটি (জমি ও বিল্ডিং এর মূল্য বাদে) এবং ৫০-১০০ জন শ্রমিক কাজ করে- এমন প্রতিষ্ঠানকে মাঝারি শিল্প বলা যাবে।

স্বাধীনতা পরবর্তীকালে প্রথম শিল্পনীতি ১৯৭১-৭৫ এ এসএমই (ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প) খাতকে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়া হয় নি। ১৯৭২ সালের বাংলাদেশের শিল্প কারখানার প্রায় ৯২% জাতীয়করণ করা হয়। দ্বিতীয় শিল্পনীতির (১৯৭৫-৮১) সময়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো ব্যক্তিখাতে ছেড়ে দেয়া শুরু হয়। বর্তমান শিল্পনীতি ২০১০ এ সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন, দারিদ্র্য দূরীকরণ ও বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক এই শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৯ সালে এসএমই ও স্পেশাল প্রোগ্রামস নামে একটি আলাদা ডিপার্টমেন্ট অন্তর্ভুক্ত করেছে। বেসরকারি ব্যংকগুলোও বাংলাদেশ ব্যাংকের এ ভূমিকায় বিভিন্নভাবে সহায়তা করছে।উদাহরণস্বরূপ বাংলাদেশ ব্যংক ও কিছু বেসরকারি ব্যাংকের উদ্যোগে সাতক্ষীরায় এসএমই উদ্যোক্তাদের ২ কোটি ৮২ লাখ টাকার চেক বিতরণ করা হয়। এ খাতের উন্নয়নে সরকার শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে এসএমই ফাউন্ডেশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠা করে। এ প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন প্রসিক্ষণ এবং পৃষ্ঠপোষকতা দানের মাধ্যমে এসএমই খাতের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।

এডিবির তথ্য মতে, বর্তমানে দেশে ৬০ লক্ষ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প আছে যা জিডিপিতে ২৫% অবদান রাখছে। এর মধ্যে ৬০-৬৫% এসএমই ঢাকা ও চট্টগ্রামে মেট্রোপলিটান এলাকার বাইরের। এ খাত শিল্পায়ন খাতের ৮০% কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে যা আমাদের মোট শ্রমশক্তির ২৫%। এসএমই খাতের বৈশিষ্ট্যগুলোর দিকের তাকালে দেখা যায়, অধিকাংশই ব্যক্তিমালিকানায় পরিচালিত, শ্রমঘন প্রযুক্তির ব্যবহার, দরিদ্র জনগণকে লক্ষ্য করে পণ্য উৎপাদন করে। এসএমই খাতের মধ্যে তৈরি পোশাক, পাট ও চামড়া শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এর মধ্যে তৈরি পোশাক খাত থেকেই আমাদের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসছে । এ খাতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো উৎপাদিত পণ্যের কাঁচামালের সিংহভাগই আমদানি করতে হয় এবং পণ্য বিক্রয়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর উপর অতিমাত্রায় নির্ভর করতে হয়।

এসএমই খাতের বিকাশে যে বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেয়া উচিত তার মধ্যে এখাতে ই-কমার্সের সর্বোচ্চ ব্যবহার, রপ্তানি পণ্য বহুমুখীকরণ, রপ্তানি বাজার বহুমুখী করা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা, জামানতবিহীন ঋণ পাওয়াকে সহজতর করা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা করা, এসএমই ওয়েবপেইজের ব্যবস্থা , আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে কমিয়ে আনা এবং গবেষণা খাতে জোর দেয়া।

এসএমই খাতের অগ্রগতিকে যে কয়েকটি বিষয় বাধাগ্রস্থ করে তার মধ্যে দুর্বল বিপণন ব্যবস্থা, পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করতে না পারা, অপ্রতুল বিনিয়োগ, অদক্ষ কারিগর, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, ব্যাংক ঋণ পেতে মারাত্মক জটিলতা, অশুল্ক বাঁধা ইত্যাদি। তাছাড়া প্রয়োজনীয় তথ্য ও পরিসংখ্যানের অভাবে এসএমই খাতের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হয় না।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশে দরকার সরকারি-বেসরকারি সব পক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে এসএমই খাতে গুরুত্ব দেয়া ছাড়া বিকল্প নেই।

লেখকঃ আতিকুল ইসলাম অপু
অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়