একজন মানুষ যেভাবে নেতা হন

250173_3785906126047_1145285413_nব্যাংকিং ব্যবস্থায় একটি ব্যতিক্রমী সংস্করণ গ্রামীণ ব্যাংক।ডঃ মুহম্মদ ইউনুস,যিনি আদৌ কোনো ব্যাংকার ছিলেন না, এই ব্যাংকের ধারণার প্রবর্তন করলেন।তিনি এমন একটি মডেল দাঁড় করালেন যেখানে গরীব মানুষদেরকে ব্যাংকিং সুবিধা দেয়া যায়,তাদেরকে কোনো জামানত ছাড়াই ঋণ দেয়া যায়।সে সময় এই ধরণের একটি ব্যবস্থার কথা আর দশজন ব্যাংকারের কাছে কিন্তু অকল্পনীয় ছিল।প্রশ্ন আসতে পারে যে কাজটি একজন দক্ষ, অভিজ্ঞ ব্যাংকার পারলেন না সে কাজটি ডঃ মুহম্মদ ইউনুস কিভাবে পারলেন? একজন দক্ষ ব্যাংকার সবসময় চেষ্টা করেন প্রচলিত ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে। তিনি এই ব্যবস্থার একজন দক্ষ সেবক হয়ে ওঠেন।তিনি এই ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবেন না।এর খুঁত তার চোখে পড়বে না।সে জায়গায় ডঃ মুহম্মদ ইউনুস বাস্তবতা থেকে তাড়িত হয়েছেন।নিজের মতো করে চিন্তা করেছেন,সমস্যা সমাধান করতে চেয়েছেন নিজের মতো করে। তিনি প্রচলিত ব্যাংকিং নিয়ম কানুনের মধ্য দিয়ে যান নি, যখন যেখানে যেটা প্রয়োজনীয় মনে হয়েছে যুক্ত করেছেন, দাঁড় করিয়েছেন একটা নতুন মডেল। এভাবেই তিনি একটি নতুন ব্যবস্থার জন্ম দিলেন, হলেন গরীবের ব্যাংকার, পরিণত হলেন তাদের নেতায়।

নিবিষ্টতা এবং নেতৃত্ব
নতুন চিন্তা আসে কোনো বিষয়ের গভীর পর্যবেক্ষণ এবং আত্মোপলব্ধির মধ্য দিয়ে। এ ক্ষেত্রে মানসিক একাকিত্ব এবং আত্মনিমগ্নতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগ গুরু ওয়ারেন বাফেট ওয়ালস্ট্রিটের চাঞ্চল্যকর,প্রযুক্তি-পরিবেষ্টিত,তথ্য-বোঝাই পরিবেশ থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করতেন। তিনি থাকতেন ওমাহা শহরে। নিজের বাসায় দরজা বন্ধ করে একা একা কোম্পানিগুলোর প্রোফাইল দেখতেন,প্রয়োজনীয় বিশ্লেষণ করতেন,সিদ্ধান্ত নিতেন।

চীনের মহান নেতা মাও সে তুঙ এর মধ্যেও এই প্রবণতা লক্ষণীয়। তিনি দৈনন্দিন কাজের বড় একটা সময় কাটাতেন অধ্যয়নে,নিঃসঙ্গ অবস্থায়। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির বিভিন্ন ক্রান্তি-কালীন সময়ে তাঁর মতামতগুলো ছিল অনেকটাই নিশ্ছিদ্র। প্রথম দিকে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি মাও সে তুঙের অনেক মতামতকে উপেক্ষা করে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।সেই সিদ্ধান্তগুলো পার্টির জন্য ভালো কিছু বয়ে নিয়ে আসতে পারে নি।মাও সে তুঙ যখন পার্টির নেতৃত্বে চলে আসেন তখন থেকেই পার্টি বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফল হওয়া শুরু করে।১৯৩৭ সালে জাপান চীন আক্রমণ করে। আক্রমণ ঠেকাতে চীনের ক্ষমতাসীন ন্যাশনাল পিপল’স পার্টি মাও সে তুঙের কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সমঝোতায় আসতে চায়। পার্টির অনেকের বিরোধিতা সত্ত্বেও মাও এই সমঝোতায় আসতে সম্মত হয়। তারপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখনি জাপান চীনের কাচে আত্মসমর্পণ করে তখনি মাও ন্যাশনাল পিপল’স পার্টির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং শেষ পর্যন্ত জয়লাভ করে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টি প্রথমবারের মতো চীনের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। মাও সে তুঙ পত্তন করেন আজকের “পিপল’স রিপাবলিক অব চায়না” র। এভাবেই বিভিন্ন ক্রান্তিকালীন সময়ে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন স্থিতধী নেতাগণ। মহান ধর্মীয় নেতাদের মধ্যেও এই প্রবণতা দেখা যায়। ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হযরত মুহম্মদ (সঃ) এবং বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধের ধ্যানমগ্ন থাকার কথা আমার সবাই জানি।

নয়া নেতৃত্ব বিকাশে প্রতিবন্ধকতা – আমলাতন্ত্র 
তবে নতুন চিন্তার জন্য একটি বড় বাধা হলো আমলাতন্ত্র। আমলাতন্ত্র কনফরমিস্ট চায় যারা একটি ব্যবস্থার সাথে মানিয়ে চলতে পারবে। নতুন চিন্তা এখানে নিরুৎসাহিত করা হয়। যেখানে সৃজনশীলতাকে নিরুৎসাহিত করা হয় সেখানে ব্যক্তি উপরে ওঠার জন্য ব্যবহার করে কিছু আমলাতান্ত্রিক কৌশল।তার মধ্যে ঘুষ, উর্ধ্বতনদের বিভিন্নভাবে খুশি করার চেষ্টা এবং অধঃস্তনদের উন্নতি বাধাগ্রস্ত করার প্রচেষ্টা অন্যতম।আমলাতন্ত্রের ভিতরে একধরণের যান্ত্রিকতা আছে।এই যান্ত্রিকতা যেমন নতুন চিন্তা, নতুন নেতৃত্ব বিকাশে বাধাগ্রস্ত করে অন্যদিকে তেমনি প্রচলিত নেতৃত্বের চিন্তার প্রায়োগিকতা নিশ্চিত করে। ফলে নতুন নেতৃত্ব যখন বিকাশের প্রথম বাধাগুলো পেরিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পারে সেই আমলাতন্ত্রই কিন্তু এই নতুন নেতৃত্বের প্রায়োগিকতা নিশ্চিত করবে।

সবশেষ কথা- একটি বিষয়ে নানাজনের নানা মত থাকতে পারে।অনেকের মতামত আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হতে পারে।তার মানে এই নয় যে সেটাই সর্বোত্তম মত।আমরা যদি সমস্যাটা নিয়ে গভীরভাবে নিজের মতো করে চিন্তা করি বের হয়ে আসতে পারে সব চেয়ে কার্যকর মতটি। এ জন্য প্রয়োজন নিজেকে পর্যাপ্ত সময় দেয়া, কোনো সমস্যার গভীরে যাওয়ার প্রবণতা। যেকোনো সাংগঠনিক ক্রান্তিকালে চিন্তক মানুষরাই পারে সঠিক দিক-নির্দেশনা দিতে ।