স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠা করা চ্যালেঞ্জিংকাজ সারা বিশ্ব জুড়েই। যুক্তরাষ্ট্রে নব্বই শতাংশ উদ্যোক্তাগণ ব্যর্থ হন তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে। সেই সংখ্যা আরো বেশি বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বে। এই ব্যর্থতার হারকে কমিয়ে আনার জন্য তৈরি হয়েছে ইনকিউবেশন সংগঠনের। যারা ছোট ছোট বিজনেস প্রতিষ্ঠান গুলোকে সাহায্য করে এবং মার্কেটে প্রতিষ্ঠিত হতে বিভিন্ন উপায়ে সহযোগিতা করে। প্রাভা হেলথের প্রতিষ্ঠাতা সিলভানা কাদের সিনহা বলেন “আপনার কাছে যত ধরণের রিসোর্স আছে, যত নেত্টওয়ার্কিং আছে, ব্যবসাকে বড় করার যত পথ খোলা আছে সব ধরণের রিসোর্সই ব্যবহার করতে হবে, কারণ আপনি একা একা কোন বিজনেস দাড় করাতে পারবেন না। অন্যের সহযোগিতা আপনার অবশ্যই প্রয়োজন পড়বে। সেই সহযোগিতা হতে পারে মানসিক, কৌশল নির্ধারণে বা টেকনিক্যাল। অন্যের সাহায্য নিতে লজ্জিত হওয়ার যৌক্তিকতা নেই।“

“আপনি একা একা কোন বিজনেস দাড় করাতে পারবেন না। অন্যের সহযোগিতা আপনার অবশ্যই প্রয়োজন পড়বে। সেই সহযোগিতা হতে পারে মানসিক, কৌশল নির্ধারণে বা টেকনিক্যাল। অন্যের সাহায্য নিতে লজ্জিত হওয়ার যৌক্তিকতা নেই।“

এই জায়গায়ই একটা ইনকিউবেটর কাজ করে। স্টার্টআপকে এই বিষয় গুলোর ক্ষেত্রে সহযোগিতা করে ছোট হতে সেই প্রতিষ্ঠানকে উচ্চতার শিখরে পৌঁছায়। ইনকিউবেশন কিংবা এক্সিলারেটর প্রোগ্রাম গুলো একটা কোম্পানীর মেন্টরশিপ সরবরাহ করণ, নেটওয়ার্কিংয়ের ক্ষেত্রে সাহায্য করণ, এবং বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পরামর্শ প্রদান করে থাকে।

ইনকিউবেশন এবং এক্সিলারেটর প্রোগ্রাম গুলো সারা বিশ্বেই দেখা যায়। ভারতে প্রায় ১৪০ টির মত এ ধরণের প্রোগ্রাম রয়েছে। চায়না ও আমেরিকার রয়েছে যথাক্রমে ২৪০০ এবং ১৫০০ প্রোগ্রাম। যদিও বাংলাদেশে মাত্র কয়েকটি প্রতিষ্ঠান শুরু করেছে কিন্তু এটিও দেশের জন্য ভালো লক্ষন। এ ধরণের প্রোগ্রাম বা প্রতিষ্ঠান তৈরি হওয়ার অর্থ হলো দেশে নতুন নতুন বিজনেস প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে যাদের ইনকিউবেশন দরকার। সেই ধরণেরই কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এবং প্রোগ্রাম সম্পর্কে বিনির্মাণের পক্ষ হতে তুলে ধরা হলো যাদেরকে ব্যবহার কাজে লাগাতে পারে স্টার্টআপ গুলো।

ওয়াই জ্ঞাপ বাংলাদেশঃ

ওয়াই জ্ঞাপ বাংলাদেশ সেসব উদ্যোক্তাদের সহায়তা করে থাকে যারা লোকাল সমস্যা গুলোর সমাধান নিয়ে ব্যবসায়ে নেমেছে। এক সপ্তাহ ট্রেইনিং এবং পরের ছয় মাস দেখাশুনার কাজটি করে থাকে ওয়াই জ্ঞাপ। সাত দিনের এক্সিলারেটর প্রোগ্রামে শিখানো হয় কোন ধরণের বিজনেস মডেল ব্যবহার করা উচিৎ, কোন মডেলে কি সুবিধা বা অসুবিধা, কোন টুলগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে বিজনেসকে আরো গতিশীল করা সম্ভব হবে। এছাড়াও ছয় মাসের মনিটরিংয়ে থাকার সুযোগ রয়েছে স্টার্টআপ গুলোর যেখানে তারা কৌশল নির্ধারণের সহায়তা পাবে স্পার্ক থেকে, দক্ষ গ্রাফিক ডিজাইনার দিয়ে কাজ করানোর সুযোগ পাবে, লিগ্যাল পরামর্শ প্রয়োজন হলে সে সহায়তাও পেতে সক্ষম হবে। স্টার্টআপের সবচেয়ে বড় যে চ্যালেঞ্জ মূলধনের অভাব সেই সমস্যা দূরীকরণে ওয়াই জ্ঞাপ বিভিন্ন বিনিয়োগকারীদের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেয়। ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ওয়াই জ্ঞাপ ইতোমধ্যেই ৬০টিরও বেশি স্টার্টআপ কোম্পানীকে ইনকিউবেশন দিয়ে আসছে। তার মাঝে পঞ্চাশ শতাংশেরও বেশি স্টার্টআপ এখনো তাদের বিজনেস পরিচালনা করে যাচ্ছে।

জিপি এক্সিলারেটরঃ

দেশের সর্বপ্রথম  এক্সিলারেটর প্রোগ্রাম শুরু হয় জিপির মাধ্যমে ২০১৫ সালের অক্টোবর মাসে। চার মাসের এক্সিলারেটর প্রোগ্রামের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের সুযোগ দেওয়া হয় তার বিজনেসকে দাড় করানোর। এছাড়াও ১২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা দেয় যা মূলধন হিসেবে ব্যবহার করতে পারে একজন উদ্যোক্তা। তাদের জন্য বিভিন্ন ব্যাচ তৈরি করে এবং তাদেরকে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। ইতোমধ্যেই ২৬টি স্টার্টআপ মার্কেটে অপারেশন করছে জিপির এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে।

বাংলালিংক আইটি ইনকিউবেটরঃ

বাংলালিংক আইটি ইনকিউবেটর হচ্ছে বাংলালিংক টেলিকম ও বাংলাদেশ হাই টেক পার্ক অথোরিটির সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তৈরি একটি প্রোগ্রাম। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ইতোমধ্যেই ১০টির মত স্টার্টআপকে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। যদিও বাংলালিংক আইটি ইনকিউবেটর কোন ধরণের ফান্ডিং সুবিধা দেয়না কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু স্টার্টআপকে অবকাঠামোগত উন্নয়ন,লজিস্টিক,মেন্টরিংয়ের দিক গুলোতে সাহায্য করছে।

ওয়াই ওয়াই গোষ্ঠী ইনকিউবেটরঃ

ওয়াই ওয়াই গোষ্ঠী হচ্ছে দেশের সর্বপ্রথম স্বাধীন ইনকিউবেটর প্রতিষ্ঠান। ২০১৬ সাল থেকেই মূলত সোশ্যাল বিজনেসে ইনকিউবেশনের কাজটি করে যাচ্ছে তারা। মাঝে মাঝে ইএমকে সেন্টারের মাধ্যমে তাদের বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করে থাকে। গত দুই বছরে ২৩টি সামাজিক ব্যবসাকে প্রতিষ্ঠিত হতে সহায়তা করেছে এই ইনকিউবেটরটি ।  স্টার্টআপ গুলো ট্রেইনিং, কোচিং, মেন্টরিং সহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকে চার মাস জুড়ে। ফান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে তারা বিনিয়োগকারীদের সাথে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। সামাজিক ব্যবসা নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী এমন উদ্যোক্তাদের জন্য ওয়াই ওয়াই গোষ্ঠী হতে পারে প্রথম পছন্দ।

ব্র্যাক আরবান ইনোভেশন চ্যালেঞ্জঃ

দেশের বিভিন্ন সমস্যার ইনোভেটিভ সমাধান নিয়ে যারা বিজনেস করছেন কিন্তু নানা রকম প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছেন তাদের জন্য রয়েছে ব্র্যাকের আরবান ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ। প্রথম ধাপে সফল হওয়ার পর এ বছর তাদের দ্বিতীয় পর্যায়ের কার্যক্রম শুরু করেছে। নির্বাচিত স্টার্টআপ গুলো পাঁচ লক্ষ টাকার মত বিনিয়োগ সুবিধা পাবে ব্রাকের বিনিয়োগ কমিটির মাধ্যমে। এছাড়াও তাদের জন্য থাকছে প্রশিক্ষণ, মেন্টরশিপ, নেটওয়ার্ক, ব্রাকের অফিস ব্যবহারের সুযোগ ইত্যাদি।

স্টার্টআপ কোম্পানী গুলো ব্যর্থ হওয়ার পিছনে অনেক কারনই দায়ী। তার মধ্যে অন্যতম উদ্যোক্তাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না থাকা, মূলধন না থাকা, নেটওয়ার্কিং না থাকা ইত্যাদি। দেরীতে হলেও আমাদের দেশেও ইনকিউবেশন প্রোগ্রাম চালু হওয়াটা উদ্যোক্তাদের জন্য ভালো সংবাদ। এবং দারুণ সুযোগও বটে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে যে কেউই বিজনেসম্যান হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।